- 05 April, 2026
- 0 Comment(s)
- 76 view(s)
- লিখেছেন : মীরা কাজী
বেশ কয়েকদিন ধ’রে একটা ব্যাপার বেশ ভাবিয়ে তুলেছে জহিরনকে। পাড়ার মানুষজনের হাবভাব সে মোটেই বুঝে উঠতে পারছে না। তারা দু চারজন কাছাকাছি হলেই গলা নামিয়ে নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করছে, জহিরন কাছে গেলেই চুপ করে যাচ্ছে। ব্যাপারখানা কী, শুধোতে গেলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে যা একটু আধটু কানে এসেছে তা থেকে জহিরনের ধারণা হয়েছে,তাদের গাঁয়ে কেউ একজন আসছে। কিন্ত কে আসছে, কেনই বা আসছে, সেটি জহিরনের কাছে কেউ ভাঙ্গছে না। তার গাঁয়ে নতুন কিছু ঘটবে অথচ সে জানবেনা এমনটা কোনওদিন হয়নি। ব্যাপারটা জানার জন্য তার ভিতরটা আঁকুপাঁকু করতে থাকে।
সেদিন সকালে উঠে জহিরন জানতে পারে,পাশের বাড়ির লাতিফ পড়ে গিয়ে তার কোমর ভেঙেছে। লতিফকে দেখতে গিয়ে জহিরনের চিন্তাটা আরো জ়ট পাকিয়ে যায়। লতিফ মাচায় উঠে তোরঙ্গের ভিতর কিছু একটা খুঁজছিল। হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়ে এই বিপত্তি ঘটেছে।
হ্যারে, সালেমা, লতিফ মাচায় উটেইলো ক্যানে? লতিফের বৌকে শুধোয় জহিরন।
- দলিল খুঁজছিল গো, দলিল! দলিল দলিল করে যে মানুষটার মাথা খারাপ হয়ে গ্যাচে! লতিফের কোমরে সেঁক দিতে দিতে বলে লতিফের বৌ সালেমা।
- দলিল খুঁজচে ক্যানে? জমি কিনবে লিকিনি?
- শুধু কী জমি, জমিদারি কিনবে যে তোমার ভাইপো! আমরা মরচি নিজেদের জ্বালায়, তার মদ্দে তুমি এলে তামাশা করতে? ঝাঁঝিয়ে ওঠে সালেমা।
আর কথা বাড়াবার ভরসা পায় না জহিরন। মুখ চুন করে লতিফের পায়ের কাছে খানিক বসে থেকে সেখান থেকে উঠে পড়ে।
সালেমার রাগের কারণটা ঠিক ধরতে পারে না জহিরন। জমি-জিরেত কেনাবেচার সময় দলিল দস্তাবেজ লাগে, এটা জানে সে। সাধারন বুদ্ধি থেকেই জানে। বেচা-বিক্রীর কথা তো আর বলা যায়না, তাতে লতিফের মানে লাগতে পারে। তাই কেনার কথা বলেছে সে। তাতে সালেমা এতে চটে গেল কেন? কেমন যেন হেঁয়ালীর মধ্যে পড়ে যায় জহিরন।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হাসিবুর সাহেবের দলিজ পেরিয়ে ভেতর বাড়িতে গিয়ে ঢোকে জহিরন। এ বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত-সেই ছোটোবেলা থেকে। হাসিবুর আর সে একই দিনে জন্মেছিল। মায়ের মুখে শুনেছে জহিরন। ছোটোবেলায় সে হাসিবুরকে ‘তুই-তোকারি’ করতো। এখন হাসিবুর গাঁয়ের একজন মানী লোক। জহিরন এখন তাকে ‘তুমি’, ‘হাসিবুর ভাই’ বলে। বাড়িতে ঢুকে জহিরন দেখতে পায় হাসিবুরের দুই ছেলে মুজিব আর আকিব নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। তাদের সামনে কিছু কাগজপত্র ছড়িয়ে আছে। জহিরন সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে তারা যেন তাকে দেখতেই পায়না। উঠোন পেরিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে যায় জহিরন।
- কই, বড় বৌ, একটা বটি দাও দিনি? দাওয়ায় রাখা পুনকো শাকের ঝুড়িটা টেনে নিয়ে সেখানে বসে পড়ে জহিরন।
মুজিবের বৌ বিলকিস বটি এনে দিলে স্বস্তি পায় সে। কাজ করতে করতে খানিক গল্প করা যাবে।
- লতিফের খবর শুনেচো?
- কি খবর ফুফু?
- হায় আল্লা! শুনোনিকো? সে মাচা হনে পড়ে গেচে যে!
- কই শুনিনি তো? কি ক’রে পড়ল? বিলকিসের সাথে সাথে আকিবের বৌ সাইনাও কৌতূহলী হয়ে ওঠে।
কাগজ না দলিল ক্যা জানে মা,কী খুঁজতে মাচায় উটেইলো, মাতা ঘুরে দড়াম্ করে নামোয় পড়েচে। এমুন পড়েচে যে কোমরের হাড়টো মটাম্ করে ভেঙ্গে গেচে। আহাগো! যাতোনায় ছেলেটা আচাড়ি-পিচাড়ি কচ্চে! দেকে বুক ফেটে যেচে! জমি-জিরেত য্যাকোন কিনবিনাকো,ত্যাকোন মাচায় উটে দলিল খুঁজার কী দরকার ছেলো? সি কতাটো বলতে গেনু ,সিটো কী এমুন দোষের কথা! তা সালেমা মুখ ঝামটে উটলো। ভালোর কাল নাইকো মা!
বিলকিস ও সাইনা দুই জায়ে জহিরনের কান বাঁচিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বলাবলি করে। কান খাড়া করেও সবটা শুনতে পায় না জহিরন।
- কিসের কথা বলচো অ বৌরা?
- ও কিছুনা, তুমি শাক কটা তাড়াতাতাড়ি বেছে দাও।
- তাড়াতাড়িই তো বাচ্চি বাচা, কতা বললেও দোষ! ব্যাজার মুখে শাক বাছতে থাকে জহিরন।
সাত কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে জহিরনের। এমন কান্ড কখনও দেখেনি সে। গাঁ-ঘরের সবাই যেন তার সাথে লুকচুকুনি খেলছে। হাসিবুর বাড়িতে থাকলে ব্যাপারটা তার কাছে খোলসা করা যেত। সে এখন তার বড় মেয়ের বাড়ি গেছে। জহিরনের এই সমস্যার কালে হাসিবুরের মেয়ের বাড়িতে অসুখ বাধল! আর হাসিবুর সেখানে গিয়ে বসে রইল! কিছুটা অভিমান এসে মিশে যায় জহিরনের কৌতূহলের ভিতর।
গাঁয়ের মানুষজন জহিরনকে গুনতির মধ্যে ফেলেনা। সে যেন একটা ফাউ! তিনকুলে যার কেউ নাই, সে ফাউ ছাড়া আর কী! তার মা ছিল খ্যাপাটে ধরনের মানুষ। সবাই বলত তার কাছে নাকি জ্বিন আছে। জহিরনের অবশ্য তা মনে হয়নি কোনও দিন। তবে সে দেখেছে,তার মা কিছুদিন আর পাঁচজনের মত স্বাভাবিক থাকত। ঘরের কাজ কাম করত। আবার কিছুদিন সে খাওয়া-দাওয়া করতো না। রাতে ঘুমাতো না। সবসময় বকবক করতো। জহিরনের দিকে ঘুরেও তাকাতো না। দেখেশুনে জহিরনের পায়ের তলাকার মাটি টলমল করতো, বুকের ভিতর কুলকুল করে কান্নার বান ডাকতো। সেই সময় হাসুবুরের মা লুতফা চাচী তাকে খুব করেছে- এর ওর হাত দিয়ে ডেকে পাঠিয়ে,শুধো-আবা করেছে, কাছে বসিয়ে খাইয়েছে। বাপকে জহিরনের মনেই পড়ে না। সে যখন খুব ছোটো, তখন তার বাপের ইন্তেকাল হয়। ‘শবেবরাতের’ সময় মায়ের সাথে গিয়ে বাপের কবরে পিদিম জ্বালিয়ে আসত সে। এখনও হর ‘শবেবরাত’এর রাতে পিদিম জ্বালিয়ে আসে। এখন তার চারটে পিদিম লাগে। বাপ-মায়ের কবরের জন্য দুটো আর দাদো-দাদীর কবরের জন্য দুটো।
বয়সটা যে ক্রমশ তাকে কাবু করে ফেলেছে, এটা বেশ বুঝতে পারে জহিরন। এখন আর আগের মত এ পাড়া ও পাড়া হটর- হটর করে হাঁটতে পারে না। তবে বয়সের হিসেবটা নিয়ে তার কোনও মাথাব্যথা নেই। হাসিবুরের কাছে হিসেবটা রাখা আছে। সময় মত জেনে নিলেই হোল।
হাসিবুরের বাড়ি থেকে বের হতেই জহিরন দেখতে পায় কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ইশকুলে যাচ্ছে। গুড়গুড় করে তাদের দিকে এগিয়ে যায় সে।
- কুল খাবে ধনেরা? খুব মিষ্টি কুল। আঁচল থেকে পাকা কুল তুলে তাদের হাতে দেয় জহিরন। হাসিবুরের বাগান থেকে এইমাত্র কুল ক’টি কুড়িয়ে এনেছে সে।
কুল নিয়ে ছেলে-মেয়েরা যাবার উদ্যোগ করতেই জহিরন বলে , “ও ধনেরা, “অ্যানাছপি"র নাম শুনেচো? সি নাকি ই গাঁয়ে আচ্চে, তুমরা কিচু জানো লিকিনি ত্যার কতা?” বিলকিস আর সাইনার কথাবার্তার মধ্যে “এন আর সি” কথাটা ছিল। “এন আর সি “ তার কানে “অ্যানাছপি” হয়ে ধরা দিয়েছে।
- “অ্যানাসপি"! সেটা আবার কী? ছেলে-মেয়েরা মুখ চাওয়াচায়ি করে। তারপর হাসতে হাসতে চলে যায়।
জহিরনের কৌতূহলের নিরসন হয় না। হাসিবুর ছাড়া আর একজন আছে এ গাঁয়ে, যে জহিরনকে গুনতির মধ্যে রাখে, ফাউ ভাবেনা। সে হল গোবিন্দো ঘোষ। অগত্যা তার কাছে যাবে বলে মনস্থির করে সে।
সবাই গাঁ ছেড়ে বেরোয় মাঝে-মধ্যে। কেবল জহিরনের যাওয়া হয় না কোথাও। ছোটো বেলায় একবার না দু-বার মায়ের সাথে সে পাশের গাঁয়ে তার খালার বাড়ি গিয়েছিল,আর বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে মেরে কেটে সাতটা মাস। এই হল তার গাঁয়ের বাইরে থাকা। তার স্বামী কার সাথে না কার সাথে মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে এসে সেই যে বিছানা নিয়েছিল আর ওঠেনি। সে মারা যাবার দিন কতক পরে মায়ের সাথে এই গাঁয়ে ফিরে এসেছিল জহিরন। সেই থেকে এই গাঁয়ের মানুষজ়ন,ঝোপঝাড়, পুকুর ঘাট, ধুলোমাটির সাথে লেপ্টে রয়েছে সে। একটা খালাতো ভাই এখনও বেঁচে আছে। অনেকবার তার কাছে যেতে চেয়েও যেতে পারেনি জহিরন।কবরডাঙা পেরিয়ে জমির দু একটা আল টপকেছ কী টপকায়নি ওমনি কারা যেন হাঁক পেড়েছে - “ দাঁড়া, আমাদিকে ফেলে চললি কুতা? এ্যাতো নেমোখারাম কবে হনে হলি তুই?----!’’ জহিরন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রাগ করে বলেছে - “তুমরা আমাকে লিয়ে অমন আটু-পাটু কর ক্যানে বলদিনি? দুটো দিন কুতাও জুড়োতেও পারবুনি?’’ মুখে বলেছে বটে, তবে সে হাঁক উপেক্ষা করার সাধ্য্ জহিরনের হয়নি কোনওদিন।
সাময়িকভাবে পাড়ার মানুষজনের ওপর অভিমান হলেও পাড়ার মানুষ যে তাকে দ্যাখে, এটা মনে মনে স্বীকার না করে পারে না জহিরন। পালা-পরবে, বিয়ে-সাদিতে, এমনকি বাড়িতে লোক-কুটুম এলেও জহিরনকে এক থালা ভাত পাঠাতে ভোলেনা কেউ। তারপর মাথার ওপর ছাতা ধরে আছে হাসিবুর। তার বাকুলে গেলে খালি হাতে ফিরতে হয়না।
গ্রামের প্রাইমারী ইশকুল পেরিয়ে ঘোষপাড়া ঢোকার মুখে, সাধুবাগদীর মেয়ে মালতীর সাথে দেখা হয়ে যায় জহিরনের। সে তখন শাক তুলে ফিরছে।
- কুতায় চললে গো পিসী? মালতী বলে।
- এই তো, এই পুঞ্চাইতের আপিচে যেচি রে মা। দেকি, বেদোবা- ভাতারের টাকাটো যেদি পাই। সাদু দাদা ক্যামোন আচে বলদিনি? গোবিন্দো ঘোষের কাছে যাবার কথাটা চেপে যায় সে।
- বাবা তো আর হাঁটাচলা করতে পারে না। শুয়ে বসেই থাকে। তুমার কতা খুব বলে।
- আহা গো! বলবে বৈকি। আমাকে যে নিজের বুনের মতুন দ্যাকে? সাদু দাদাকে কতোদিন দেকিনাই। পায়ে যে জোর পাইনাকো আর। দেকি, এই ক’রেই এ্যাকদিন যাব। হ্যাঁ রে মালতী! “অ্যানাছপি" না ক্যা এ্যাকজুনা আমাদের গাঁয়ে আচ্চে,কানাঘুষো শুনচি। তুই কিচু শুনিসনাই?
- “অ্যানাছপি" নয় গো পিসী, সি হলো “ইনারপিচ"। তুমার জামাই তো বলছেলো তার কতা। তার নেগে নাকি সাব্বাই কাগজ খুঁজতে নেগেচে। পোরোনো ধোরোনো কাগজ। বলচে, কাগজ য্যাতো পোরোনো হবে ত্যাতোই ভাল।
- পোরোনো ধোরোনো কাগজ! কী হবে সি সব দিয়ে?
- তা জানিনে বাপু , তবে দেকচি তো তুমার জামাইকে, কাজ-কাম খুঁজা বাদ দিয়ে কাগজ খুঁজতে নেগেচে। চালের বাতায়,ইকেন সিকেন কাগজ খুঁজেই যেচে। আর ইদিকে আমার হয়েচে জ্বালা!
- উঁ, তাই! আমি এ্যাকোন বাড়ি যাই বুজলি। হঠাৎ করে কিছু একটা মনে পড়ে যায় জহিরনের। সে বাড়ি যাবার জন্য পিছন ফেরে।
- কি হোল পিসী, আপিচে যাবেনা? মালতী অবাক হয়ে শুধোয়।
- এ্যাকোন তো দোপোর বেলা, খাওয়া দাওয়ার সুমোয়। তাই ভাবচি বেলাটো পড়লে না হয় আসবো।
- সেই ভালো।
জ়হিরনকে বিকেলে কোথাও যেতে হয়না। ঘরের কাছেই গাঁয়ের কবর ডাঙ্গার রাস্তায় গোবিন্দো ঘোষের সাথে দেখা হয়ে যায় তার। একটা বিশেষ কাজে গোবিন্দো ঘোষ এ পাড়ায় এসেছে। গ্রামের মানুষজনকে একত্রিত করে একটা আলোচনা সভা করা দরকার। “এন.আর.সি’’ নিয়ে সবার মনে একটা অজ়ানা আতঙ্ক কাজ় করছে। এটাকে আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। হাসিবুর সাহেবের সাথেও ফোনে কথা হয়েছে তার। তিনি দু এক দিনের মধ্যেই ফিরে আসছেন। এখন প্রাথমিক উদ্যোগটা গোবিন্দো ঘোষকেই নিতে হবে। আজ় এ পাড়ার কয়েক জ়নের সাথে কথা বলে যাবে সে।
- কেমন আছ গো পিসী?
- ওই,আচি। আমার আবার থাকা।
- “বিধবা ভাতার” টাকাটা ঠিকঠাক পাচ্ছ তো?
- তা পাচ্ছি। তুমার সাথে এ্যাকটা কথা ছেলো বাপ।
- কি কথা বলনা।
- হাসিবুর ভাই নাইকো, পাড়ার লোক আমার কাচে কিচু ভাঙ্গচেনি। জহিরনকে মানুষের মদ্দে ধরে কেউ! জহিরন বেওয়া যে ফাউ! তাকে গালমন্দ দাও! মুকঝামটানি দাও! কিন্তু প্যাটের কতাটি ভুলেও তার কাচে বোলোনি!
- আহা! রাগ করছ কেন, বল না কী হয়েছে?
- “অ্যানাছপি”সাহেব বলে কেউ এ্যাকজুনা আমাদের গাঁয়ে আচ্চে; তা হ্যাঁ বাপ, “অ্যানাছপিসাহেব" ক্যা? আমাকে খুলাসা করে বলোদিনি। আমি আদকো-আদকো শুনিচি। কিন্তু ঘোর-প্যাঁচ বুজতে পাচ্চিনাকো। সাহেব কি মিটিন করতে আচ্চে ইকেনে? সেই সিবার বড় ইশকুলের মাটে যেমুন উড়োজাহাজে করে এ্যাকজুনা এয়েলো মিটিন করতে? কী ধুলো কী ধুলো! তেমুন? ই দিকে আবার লতিফ করেচে কী -----!
- না গো পিসী, তেমন কিছু নয়। জহিরনের কথার মাঝেই বলে ওঠে গোবিন্দো ঘোষ।
- সি সব কিচু লয়কো? তুমি য্যাকোন বলচো তাইলে তাই হবে। ইদিকে আবার মালতী বলছেলো-----।
- কে কী বলছে, সে সব পরে একদিন শুনব। আজ আমার একটু তাড়া আছে। গোবিন্দো ঘোষ দাঁড়ায় না আর।
- তোমার “ভোটার কার্ড”, “আধার কার্ড” এগুলো আছে? হারিয়ে ফেলোনি তো? জহিরনকে তার পিছন পিছন আসতে দেখে গবিন্দো ঘোষ বলে।
- ভুটার কাটটো রইচে। আঁদার কাট নাইকো। হাসিবুর ভাই বলেচে সিটো ইবার করে দিবে। সে হাজার কাজের মানুষ। তবে এ্যাকটো কাগজ রইচে, বাপজীর আমলের পোরোনো কাগজ। আঁচলের আড়াল সরিয়ে বিবর্ন একটা কাগজ গোবিন্দো ঘোষের দিকে বাড়িয়ে ধরে জহিরন।
গোবিন্দো ঘোষ দেখে - বহু পুরানো,প্রায় জীর্ন একটা মুদি খানার দোকানের ফর্দ। এক “পশুরি”ধান, মানে বর্তমান হিসাব আনুযায়ী পাঁচ কেজি ধানের বিনিমিয়ে কেনা চাল, ডাল, শুকনো মরিচ, গুড়, নুন,কাঁচা কয়লা ইত্যাদি কেনার হিসাব। ফর্দর্টির তলার দিকে লেখা খরিদ্দার - নিয়ামত আলী। সন- ১৯৫০। কী বলবে বুঝতে না পেরে কাগজটি হাতে ধ’রে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে গোবিন্দো ঘোষ।
গোবিন্দো ঘোষকে চুপ করে থাকতে দেখে জহিরন ভাবে,এই কাগজের গুরুত্ব হয়তো সে বুঝতে পারছেনা। কী ক’রে বুঝবে, এই কবেকার ছেলে, নাক টিপলে দুধ বেরোবে! হাসিবুর হলে ঠিক বুঝে যেত। তবে আরও পুরোনো কিছু আছে জহিরনের। যা মালতী বা লতিফের নেই। সেগুলো দেখানোর জন্য গোবিন্দো ঘোষকে ডাকে সে।
- ইদিক পানে একবার এসো দিনি বাপ।
কাজের কথা ভুলে জহিরনের পিছন পিছন হাঁটতে থাকে গোবিন্দো ঘোষ। একটা জ়ায়গায় গিয়ে আঙুল বাড়িয়ে জ়হিরন বলে - “উ-উ-ই-ই যে দ্যাকচো, নামোপারা জ়ায়গাটো? উটো হোলো আমার বাপজ়ী নিয়ামত আলীর কবর। আর উ-উ-ই! যিকেনে এ্যাকটো নিমের গাচ গোজ়ুইচে, উটো হোলো আমার মা হতভাগী তহুরন বিবির কবর। ইবার ইদিক পানে চাও। উ-ই-যে ঝোপ মতুন জায়গাটো, উইকেনে আমার দাদো মুকছেদ আলী শুয়ে রইচে! ত্যার কাচে আমার দাদী----! তাবাদে, ইধারে---! ইগুনি সব আমার চাচা -------! এ্যানাছপি ----! পোরোনো কাগজ!--- দলিল--!”
জহিরন বলেই চলে। সবুজ ঘাস, ঝোপ-ঝাড়ে ঢাকা কবরস্থানের পানে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গোবিন্দো ঘোষ।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
ছবি: সংগৃহীত
0 Comments
Post Comment